ইমন আল আহসান, কলাপাড়া: শহর কিংবা গ্রাম, পাড়া কিংবা মহল্লা যেখানেই অসহায়, দুস্থ কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের করুণ অবস্থার খবর পান, সেখানেই ছুটে যান মানবিক মিন্টু। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন তিনি।
তাঁর এমন মানবিক কর্মকাণ্ড দেখে অনেকেই প্রশংসা করে বলেন, সমাজে মিন্টুর মতো মানুষের বড়ই অভাব।সম্প্রতি মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভবঘুরে মানুষের সেবা করার পর কয়েকটি ছবি নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন মিন্টু মিয়া। সেখানে তিনি লিখেছেন, মনের ময়লা পরিষ্কার হলে শরীরেরও ময়লা পরিষ্কার হবে। তাঁর এই কথার মধ্যেও ফুটে উঠেছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পরিচ্ছন্নতার বার্তা ভবঘুরে মানুষের কাছে কখনো সাধারণ মানুষের বেশে, আবার কখনো ছদ্মবেশে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন মিন্টু।
বোঝার চেষ্টা করেন, তাঁদের মনের ভেতরে কোনো কষ্ট কিংবা না বলা গল্প লুকিয়ে আছে কি না। শুধু খোঁজখবর নেওয়াই নয়, তাঁদের চুল কাটা, দাড়ি কামানো, হাত-পায়ের নখ কাটা, গোসল করানো, নতুন পোশাক পরিয়ে দেওয়া এবং ভালো খাবারের ব্যবস্থা করাসহ নানা সেবামূলক কাজ করেন তিনি। অনেক সময় তাঁদের পাশে বসে গল্পও করেন। মানসিক ভারসাম্যহীন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে প্রথমে কথা বলে তাঁর পরিচয় ও ঠিকানা জানার চেষ্টা করেন মিন্টু। কেউ নিজের ঠিকানা সঠিকভাবে বলতে পারলে সেই ঠিকানায় যোগাযোগ করে পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করেন। এরপর প্রয়োজনীয় সহযোগিতার মাধ্যমে তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
কোনো মানসিক ভারসাম্যহীন নারী কিংবা পুরুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যন্ত্রণায় কাতরালে, কিংবা হাত-পায়ে পচন ধরে পোকায় ক্ষতবিক্ষত হলে যখন দুর্গন্ধের কারণে পথচারীরা নাক-মুখ চেপে পাশ কাটিয়ে চলে যান, তখন মিন্টু তাঁদের পাশে দাঁড়ান। আপনজনের মতো আগলে রেখে চিকিৎসকের সহযোগিতা নিয়ে নিজেই সেবাযত্নে এগিয়ে আসেন। এমন অসংখ্য মানবিক কর্মকাণ্ডের নজির রয়েছে তাঁর। ভবঘুরে ও অসহায় মানুষের খাবারের ব্যবস্থাও করেন তিনি। প্রায় প্রতিদিনই একটি অটোরিকশা ভাড়া করে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে তাঁদের মধ্যে পানি, ভাতসহ প্রয়োজনীয় খাবার বিতরণ করেন, আবার কাউকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ খাইয়ে দেয়ার দৃশ্যও দেখা যায়।
আবার কোনো বেওয়ারিশ মানুষ মারা গেলে যখন দাফন-কাফনের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায় না, তখন সেই দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন মিন্টু। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে মরদেহের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করেন। মিন্টুর রয়েছে ৬ বছরের একটি ছেলেসন্তান নাম তার রাইয়ান। মানবিক এই কাজগুলোতে অনেক সময় ছেলেকেও সঙ্গে রাখেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের জখন রক্তের জন্য সিজারিয়ান অপারেশন থেমে যায় তখন মিন্টুর খোঁজ করেন অনেকে। মিন্টুর রয়েছে ‘অন্ন দান’ নামে একটি ফেসবুক পেজ।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে অসহায়, দুস্থ ও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের চিত্র তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি তৈরি করেন বিনোদনমূলক কনটেন্টও। এসব কনটেন্ট থেকে ফেসবুকের ভিউ ও আয় দিয়ে নিজের সংসার পরিচালনার পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। নিজের মানবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মিন্টু বলেন, ভালো কাজে অনেক বাধা আসে। অনেকে বলেন, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কিংবা ব্যবসা করার জন্য আমি এমন কাজ করি। তবে ছোটবেলা থেকেই মানুষের প্রতি আমার অন্যরকম একটা টান রয়েছে। মানুষের কষ্ট, দুঃখ ও দুর্দশার চিত্র কেন জানি আমি সহ্য করতে পারি না।
তাই চেষ্টা করি মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখে একটু ভালো থাকার গল্প খুঁজে নিতে। আমি আমার কাজ করে যাচ্ছি। কে কি বলল, আর কে কি করল, সেটি আমার দেখার বিষয় নয়। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ সহযোগিতা আর মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই মিন্টুর এই পথচলা। সমাজের অবহেলিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যেন নীরবে বলে যাচ্ছেন মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।

আপনার মতামত লিখুন :