ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১০ ফুটের ঘরে ‘গোপনীয়তারও’ জায়গা নেই, জন্মনিয়ন্ত্রণে ঝুঁকছেন রোহিঙ্গারা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৯ দুপুর

২০১৭ সালে তিন সন্তানকে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন রোহিঙ্গা যুবক নুরুল কবির। গত ৯ বছরে যোগ হয়েছে আরও তিন সন্তান। তবে এখন, তিনি এখানেই থামতে চান। স্ত্রীর সঙ্গে শলপরামর্শ করে নিয়েছেন জন্মনিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত। কারণ, ১০ ফুটের ঘরে ছয় সন্তান নিয়ে বসবাস করতে গিয়ে তাদের তাদের ব্যক্তিগত পরিসর বলতে আর কিছুই নেই। একই ঘরে তাদের নাওয়া-খাওয়া, ঘুম ও সন্তানদের বেড়ে ওঠা—সবকিছুই।

নুরুল কবিরের মতো আরও অনেক রোহিঙ্গা পরিবার এখন পরিবার পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকছে। শুরুতে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণে অনাগ্রহ থাকলেও শরণার্থী জীবনের বাস্তবতা তাদের সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তেও পরিবর্তন এনেছে। ক্যাম্পের সীমিত জায়গা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও সন্তানদের দেখভালের চাপ—সব মিলিয়ে বড় পরিবারের বদলে ছোট পরিবারকেই এখন অনেকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থা আইসিডিডিআর,বি’র তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার পর রোহিঙ্গাদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হার ছিল ৩০ শতাংশেরও কম। বর্তমানে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ শতাংশে।

শুথু পরিসংখ্যান নয়, ক্যাম্পের বাজারেও পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে বদলে যাওয়ার এই চিত্রের কিছুটা দেখা গেছে। বালুখালী, মোচরাসহ বিভিন্ন এলাকার রোহিঙ্গা বাজারে কয়েক বছর আগেও বিনামূল্যে পাওয়া স্যানিটারি ন্যাপকিন কার্টনে করে খোলাবাজারে বিক্রি করতেন কেউ কেউ। বিক্রেতারা বলছেন, তখন অনেক নারী এসব ব্যবহার করতেন না। এখন স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে আগের মতো কার্টনে করে এসব পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করতে দেখা যায় না।

৪৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ উল্লাহ ২০১৭ সালে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। গত নয় বছরে পরিবারে আরও তিন সন্তানের জন্ম হয়েছে। এখন আট সন্তানের বাবা তিনি। তবে আর সন্তান নিতে চান না।

মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘চাইলে সন্তানের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। কিন্তু আমরা চাইনি, তাই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করেছি। আমরা মিয়ানমারেই ফিরতে চাই। বাংলাদেশে আমাদের বর্তমান অবস্থা অনেক কষ্টের, অসম্মানের।’

‘শরণার্থী জীবনে আর কোনো সন্তান নেব না’—মোহাম্মদ উল্লাহর প্রতিবেশী জহিরুলের সাফ কথা। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ২০২৪ সালে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে এসেছেন তিনি। তিন সন্তানেরই জন্ম মিয়ানমারে।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা মৌলিক অনেক সেবা থেকেই বঞ্চিত ছিল। বিশেষ করে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ছিল অত্যন্ত সীমিত। ফলে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে তাদের ধারণাও ছিল কম। এর সঙ্গে কৃষি ও মাছ ধরার মতো শ্রমনির্ভর পেশায় বেশি সন্তানকে পরিবারের বাড়তি কর্মশক্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল।

তাঁর মতে, বাংলাদেশে এসে পরিস্থিতি বদলেছে। একদিকে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা সহজলভ্য হয়েছে, অন্যদিকে ক্যাম্পের সীমিত জায়গা, জীবিকার সংকট ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎও রোহিঙ্গাদের সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। ইউএনএফপির সহযোগিতায় আইপাসসহ বিভিন্ন সংস্থা ক্যাম্পে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হার ৫৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

২০১৭ সালের আগে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল কয়েক লাখ। ওই বছরের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক অভিযানের পর একসঙ্গে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর নতুন করে অনুপ্রবেশ ও শিবিরে জন্মের ফলে বেড়েছে এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশে মোট রোহিঙ্গা শরণার্থী ১২ লাখ ১৭১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে রয়েছেন ১১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি, আর ভাসানচরে রয়েছেন ৩৩ হাজারের বেশি।

Link copied!