যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখতে হুতিদের সহায়তা দিচ্ছে চীন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৪ দুপুর

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সহায়তা দিচ্ছে চীন বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। হুতিদের জন্য পাঠানো চালানে চীনা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। এসব উপকরণ ব্যবহার করে নিজেদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে গোষ্ঠীটি। তবে চীনা প্রতিষ্ঠান থেকে সরঞ্জাম সরবরাহের তথ্যই বেইজিংয়ের সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক অস্ত্র গবেষণা সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, হুতিরা ইরানের খাইবার শেখান সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তত কিছু অংশ ইয়েমেনেই তৈরির চেষ্টা করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এক হাজার কিলোমিটারের বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের জন্য পাঠানো চালান থেকে বিশেষভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল, উৎপাদন সরঞ্জাম ও পরীক্ষার যন্ত্রপাতি জব্দ করা হয়েছে। এসব পণ্যের সঙ্গে চীনা সরবরাহকারীর নাম উল্লেখ করা নথিও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে গবেষণা সংস্থাটি।

গবেষকদের মতে, হুতিদের নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর এই উদ্যোগ তাদের সামরিক প্রযুক্তিতে অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে উন্নত প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত সরঞ্জাম প্রয়োজন। এ ধরনের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারলে অস্ত্রের জন্য হুতিদের ইরানের ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমতে পারে। তবে এতে ইরানের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন শেষ হয়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

ইয়েমেনে হুতিদের জন্য পাঠানো যেসব চালান কর্তৃপক্ষ আটক করেছে, সেগুলোর তথ্য থেকেই এসব সরঞ্জামের প্রবাহ সম্পর্কে জানা গেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের গবেষণায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হুতিদের জন্য জব্দ করা পণ্যের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পণ্যের অনেকগুলোই বেসামরিক কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতেও কাজে লাগানো যায়।

চীন প্রকাশ্যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা বন্ধ করতে ইরানের মাধ্যমে হুতিদের ওপর চাপ দেওয়ার চেষ্টাও করেছে বেইজিং। বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে হুতিদের হামলা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি করেছে। তবে চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য হুতিদের কাছে পৌঁছানোর তথ্য বেইজিংয়ের ঘোষিত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্টের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আল-বাশা বলেন, হুতিদের প্রতি চীনের অবস্থানকে কূটনৈতিক সুরক্ষা, বাছাই করা ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রয়োগ এবং কৌশলগত সুযোগ কাজে লাগানোর সমন্বয় হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর মতে, চীনা বাণিজ্যিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি, চীনা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার খবর রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট সেবা এবং দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জামের প্রবাহের বিষয়গুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

আল-বাশার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহারযোগ্য সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি, ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি তৈরিতে কাজে লাগতে পারে এমন সার, ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরির বিশেষ ধাতু এবং ড্রোন উৎপাদনে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। এসব পণ্যের বেসামরিক ব্যবহারও রয়েছে। ফলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যগুলোর চূড়ান্ত ব্যবহার সম্পর্কে কতটা জানত, তা নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে হুতিদের সঙ্গে চীনের যোগাযোগ বেড়েছে। চীনে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা ইয়েমেনি ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে এই যোগাযোগ আরও জোরদার হয়েছে। সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবে হুতিরা নিজেদের কয়েকজন সদস্যকে মান্দারিন ভাষা শেখার জন্যও বেছে নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এর ফলে চীনা বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বেইজিং সুবিধা পেতে পারে। বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ চীনের জন্য লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হুতিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পেছনে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হিসাবও থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভবিষ্যতে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সংঘাত দেখা দিলে হুতিরা লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুমকি তৈরি করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর মনোযোগ ও সামরিক সম্পদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে এটি বিশ্লেষকদের সম্ভাব্য কৌশলগত ব্যাখ্যা, চীনের ঘোষিত পরিকল্পনা নয়।

হুতিদের সঙ্গে সম্পর্ক চীনের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। আপাতত চীনা জাহাজগুলো লোহিত সাগরে তুলনামূলক নিরাপদে চলাচলের সুযোগ পেলেও ভবিষ্যতে সেই নিশ্চয়তা বজায় থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে হুতিদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে বেইজিংয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে।

আল-বাশার মতে, চীনের এসব কর্মকাণ্ডকে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন। হুতিদের মাধ্যমে সরাসরি সামরিক বাহিনী মোতায়েন না করেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ পেতে পারে বেইজিং। এতে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর খরচ ও ঝুঁকি সীমিত রেখে কৌশলগত সুবিধা অর্জন করা সম্ভব হতে পারে বলে তাঁর মূল্যায়ন।

তথ্যসূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ