ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি বাহিনী জানিয়েছে, তারা সশস্ত্র ইউনিট প্রস্তুত করছে। এই ইউনিট প্রয়োজনে ইরানে পাঠানো হবে। এর আগে খবর বেরিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) কুর্দিদের অস্ত্র দিয়ে ইরানে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। সত্যিই যদি কুর্দিরা ইরানে প্রবেশ করে, তাহলে তেহরানের শাসকদের বিরুদ্ধে নতুন করে বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধ দানা বাঁধতে পারে।
যদিও হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, কুর্দিদের দিয়ে ইরানে বিদ্রোহ শুরুর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। কিন্তু অতীতের ঘটনাগুলো বলছে, সশস্ত্র এই গোষ্ঠীটির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এমনকি কাজ শেষে পরিত্যাগ করার অভিযোগও আছে।
১৯৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে কুর্দিদের বিদ্রোহ করতে উৎসাহ দিয়েছিল। কিন্তু পরে যখন ইরাকি সেনাবাহিনী কুর্দি যোদ্ধাদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালায়, তখন যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে এগিয়ে যায়নি।
কুর্দি কারা?
কুর্দিরা মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় জাতিগোষ্ঠী। তাদের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি বলে ধারণা করা হয়। ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা স্বাধীন রাষ্ট্র কিংবা স্বায়ত্তশাসনের দাবি করে আসছে। এজন্য অনেকে তাদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাধীন রাষ্ট্রবিহীন জাতিগোষ্ঠী হিসেবে মনে করেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লে পরাশক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের কুর্দিদের একটি আলাদা দেশ গঠন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি। অনেক কুর্দি মনে করেন তাদের দেশ না দেওয়ার একটি বড় কারণ হলো ১৯১৬ সালের সাইকস-পিকো চুক্তি। এই গোপন চুক্তি অনুযায়ী, ব্রিটেন ও ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নিজেদের সুবিধামতো ভাগ করে নিয়েছিল।
এই বিভাজনের কারণে কুর্দিরা বিভিন্ন দেশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত নিজেরা আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে পারেনি।
দাবি আদায় না হওয়ায় কুর্দিদের অনেকে সশস্ত্র পন্থা বেছে নেয়। তাদের সবচেয়ে বড় সংগঠন হলো- কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি। তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশ এই সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
ইরানি কুর্দিরা সংখ্যায় কত বড়?
কুর্দিরা ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। তারা মূলত ইরাক সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাগুলোতে বসবাস করে। বিভিন্ন সময় ইরানের ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে হওয়া আন্দোলনে সামনের সারিতেও ছিল।
২০২২ সালে নিহত ২২ বছর বয়সী মাশা আমিনি কুর্দি ছিলেন। হিজাব পরা নিয়ে নৈতিকতা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর তিনি মারা যান। প্রতিবাদে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হলে কুর্দিদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিষয়টিও সামনে আসে। এক পর্যায়ে কুর্দি বিক্ষোভকারীরা ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত একটি শহরের সাময়িক নিয়ন্ত্রণ নেয়।
ইরানি কুর্দিদের কিছু সশস্ত্র সংগঠন বর্তমানে ইরাকি কুর্দিস্তানে অবস্থান করছে। উত্তর ইরাকের এই অঞ্চলটিতে তারা ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে অঞ্চলটিকে আধা-স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ।
কুর্দিরা কি ইরানে সংঘাতে যোগ দেবে?
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কুর্দিরা এর আগেও সীমান্ত পেরিয়ে একে অন্যকে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় এমনটা দেখা যায়। তখন তুরস্ক, ইরাক ও ইরানের কুর্দিরা একত্র হয়ে সিরিয়ার কুর্দিদের পক্ষে লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিল।
এখন ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে যদি সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কুর্দিরা কতটা একত্রিত হতে পারবে তা স্পষ্ট নয়। সিরিয়ায় কুর্দি বাহিনী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তারা ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পাহারা দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেই মিত্রতা বেশ দুর্বল। কারণ, ওয়াশিংটন এখন সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারাকে কাছে টানছে।

আপনার মতামত লিখুন :