আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ৪১ দফার এই নির্বাচনী ইশতেহারে যুব ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে দলটি এক কোটি তরুণ-তরুণীকে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, ৫০ লক্ষ তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ, ৫ লাখ নতুন উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ, যোগ্যতার ভিত্তিতে ৫০০ আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরি, স্বরাষ্ট্র ও আইন-শৃঙ্খলার মৌলিক উন্নয়নকসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে এই ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। পরে দলটির জনতার ইশতেহারের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন করা হয়। পরে স্বাগত বক্তব্য দেওয়ার জন্য মঞ্চে আসেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ইশতেহারে ইসলামি আদর্শের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এদিকে দলটির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রথম ভাগে স্বরাষ্ট্র ও আইন-শৃঙ্খলার মৌলিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেখানে ১৬টি লক্ষ্যের কথা জানিয়েছে দলটি। নিম্নে দলটির সেসব প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো:
১. পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন: স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, আধুনিক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং এআইসহ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সৎ, দক্ষ, আধুনিক, মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা হবে।
২. দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ প্রশাসন: পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিমুক্ত করতে কার্যকরী ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুলিশ সদস্যদের বেতন, আবাসন, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা হবে।
৩. জনমুখী পুলিশিং: জনগণের মনে পুলিশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
৪. আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ট্রেনিং ম্যানুয়েলে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক অনুশাসন অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
৫. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা: নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আনসার বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হবে। বাহিনীগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও যৌথ অভিযান সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
৬. আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে শক্তিশালীকরণ: আনসার বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে প্রান্তিক অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের কার্যকারিতা বাড়ানো হবে।
৭. সন্ত্রাস ও চরমপন্থা দমন: সন্ত্রাস ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তোলা হবে।
৮. নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ: নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল, হেল্পলাইন ও ভিকটিম সাপোর্ট সেল জোরদার করা হবে।
৯. স্মার্ট সিটি নিরাপত্তা: বড় শহরগুলোতে স্মার্ট সিসিটিভি, ফেস রিকগনিশন, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, রোবটিক নজরদারি এবং দ্রুত রেসপন্স ইউনিট গঠন করে নগর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
১০. কারা সংস্কার: জেলখানা সংস্কার করে কারাবন্দিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ, কারা দুর্নীতি দূরীকরণ ৭ এবং কারারক্ষীদের দক্ষতা ও মানবিকতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
১১. বাংলাদেশে পুলিশ ব্যবস্থার আইনি কাঠামো ঔপনিবেশিক আমলের (১৮৬১ সাল) পুলিশ আইন এবং রেগুলেশনের মাধ্যমে আজও পরিচালিত হচ্ছে। এই ধরনের ঔপনিবেশিক আইনসমূহ পরিবর্তন করা হবে। এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৪-২৫) পুলিশ রিফর্ম কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে।
১২. পুলিশের কার্যক্রমে কোনোভাবেই যেন রাজনৈতিক দলের প্রভাব না পড়ে তা নিশ্চিত করা হবে।
১৩. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান বন্ধ করা হবে।
১৪. কোনো মামলায় দোষী নয়, এমন ব্যক্তিদের মামলার মাধ্যমে হয়রানি এবং এ সংক্রান্ত দুর্নীতি বন্ধ করা হবে।
১৫. পুলিশি হেফাজতে থাকা বন্দিদের অধিকার রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোকে ম্যাজিস্ট্রেটের নজরদারিতে আনা হবে।
১৬. ডিজিটাল পাহারাদার অ্যাপের মাধ্যমে যেকোনো অপরাধের (যেমন চাঁদাবাজি, ঘুষ, নারী নির্যাতন) বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ডিজিটালি রিপোর্ট করা যাবে, যেখানে রিপোর্টকারীর পরিচয় গোপন রাখা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :