ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
ছাত্র রাজনীতি

সাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল- শিবির সংঘর্ষ, আহত শতাধিক

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৭ দুপুর

হামলা ও পাল্টা হামলায় গতকাল মঙ্গলবার রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে রাজধানী ঢাকার ছয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ, গ্রাফিক আর্টস ইনষ্টিটিউট, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার (আলিয়া মাদ্রাসা) ক্যাম্পাসে ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে শতাধিক আহত হয়েছেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে গতকাল দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ চলে। এতে সেখানে দুপক্ষের অন্তত ৭০ জন আহত হয়েছেন। বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হন।

দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তন, শহীদ মিনার ও বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এলাকায় সংঘর্ষ হয়। এতে গুরুতর আহত কয়েকজনকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাদের ওপর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের মহানগর দক্ষিণের নেতাকর্মীরা হামলা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। গতকাল বিকেল ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এছাড়াও রাজধানীর কবি নজরলি কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও গ্রাফিক আর্টস ইনষ্টিটিউটে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে গতকাল বিকেলে বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। আগের দিন সন্ধ্যায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে অন্তত সাতজন আহত হন।

জবিতে ছাত্রদল-শিবির-ছাত্রশক্তি সংঘর্ষ, আহত অর্ধশতাধিক

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, আবাসন সংকট দূরীকরণসহ বিভিন্ন দাবিতে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের সময় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ভিপি, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রশিবির সভাপতিসহ অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ইউজিসি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা চলাকালে এই সংঘর্ষ শুরু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে ইউজিসি চেয়ারম্যান, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও ডুয়েট উপাচার্যের উপস্থিতিতে সভা চলছিল।

কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় জেলখানার পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জমিতে এক হাজার ৬০০ সিটের অস্থায়ী হল করার কথা ছিল। কিন্তু সেটা এখন ৬০০ সিটের স্থায়ী ১০ তলা ছাত্র হলের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দুপুর ২টায় জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং আড়াইটায় জকসু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত একরের অস্থায়ী আবাসন ও সমসাময়িক বিষয়াবলি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছিল। একই সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন ও কর্মসূচির অংশ হিসেবে জকসুর কয়েকজন প্রতিনিধি ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীকে হস্তান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসাসেবা বৃদ্ধির দাবিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে অডিটোরিয়ামে ঢোকার চেষ্টা করেন। এতে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মী এবং প্রক্টরিয়াল বডি বাধা দেয়। শুরু হয় বাগ্‌বিতণ্ডা। এক পর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।

এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারেও ভাঙচুর চালানো হয়। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে শিবিরকে বহিষ্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

হামলায় জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহিন মিয়া, সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ, ছাত্রশিবির সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ এবং কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন।

আহত ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালানো হয়েছে। আমি জুলাইয়ে যেখানে গুলি খেয়েছি, সেখানেই বারবার হামলা করেছে।’

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি তুলে ধরার সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালান। এই হামলায় শিক্ষক ও প্রশাসনের নীরব সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়ে দায়ীদের অবিলম্বে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসীভ বলেন, ‘অনুষ্ঠানে প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঢুকতে বাধা দেওয়া অগণতান্ত্রিক। ছাত্রদলের ২৫-৩০ জন মিলে এক শিবিরকর্মীকে মারধর করতে দেখেছি। প্রশাসনের নির্লিপ্ততার কারণেই ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।’

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন বলেন, ‘জকসুর ব্যর্থতা ও জামায়াত-শিবিরের অপকর্ম ঢাকতেই তারা বেরোবির মতো এখানেও মব সৃষ্টির অপচেষ্টা করছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীরাই তাদের এই মব কালচার প্রতিহত করেছে।’

ন্যাশনাল মেডিকেলে সংঘর্ষ

জবি ক্যাম্পাসে সংঘর্ষে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ছাত্রশিবির ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়।

৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জবি প্রশাসন। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. মো. শেখ গিয়াস উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়েছে। কমিটিতে সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসানকে আহ্বায়ক এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. শহিদুল্লাহকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন– অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মো. মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রইছ উদ্দীন বলেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অত্যন্ত হতাশাজনক। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ও ঢাকা কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ও ঢাকা কলেজে গতকাল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

ঢাকা আলিয়ায় আবাসিক হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। গতকাল বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আলিয়া মাদ্রাসা এলাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রথম দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়। কিছু সময় পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আবারও দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

হলের সিট নিয়ে সকাল থেকেই দুই ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এক পর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই উভয় পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। কয়েকজনের হাতে লোহার পাইপ, লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দুই পক্ষকে দেশি অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হতে দেখা গেছে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার মো. মাহফুজার রহমান বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংঘর্ষে আহত ছাত্রদল নেতারা হলেন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ এবং লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বি। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নিছার উদ্দিন রাব্বি অভিযোগ করেন, তিনি কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান করছিলেন। এ সময় কয়েকজন ‘নারায়ে তাকবির’ ধ্বনি দিয়ে তাদের ওপর হামলা চালান। তিনি দাবি করেন, হামলাকারীরা ছাত্রশিবিরের কর্মী।

প্রায় দেড় ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার সময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে কয়েকশ নেতাকর্মী ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে ঢোকেন। এ সময় নয়নের মাথায় হেলমেট ও হাতে পাইপ ছিল। এর আগেই হল ছাড়েন শিবিরের নেতাকর্মীরা। শিবিরের দখলে থাকা হলের বেশ কয়েকটি রুম ভাঙচুর করা হয়। এ সময় সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল হককে মারধর করেন যুবদলের নেতাকর্মীরা। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নয়ন বলেন, ‘আপনারা সামনে যান, আমরা আপনাদের সহযোগিতা করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীদের দিকে অন্তত ২০টি হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। হলের ভেতর থেকে গুলি নিক্ষেপ করেছে তারা। শিবির দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে চায়।’

ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর পূর্বের প্রচার সম্পাদক দাউদ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় যুবদল ও ছাত্রদলের সন্ত্রাসী হামলায় ২৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ফুয়াদ নামে আমাদের এক কর্মীর অবস্থা সংকটাপন্ন।’

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদপ্রার্থী ও কামিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সাদ চৌধুরী বলেন, ‘শিবিরের সন্ত্রাসীরা দফায় দফায় আমাদের ওপর হামলা করেছে। তাদের হামলায় আমাদের ৩০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছে। দুজনের অবস্থা গুরুতর।’ রাতে আলিয়া মাদ্রাসার দুটি হলেই ছাত্রদল তালা লাগিয়ে দেয়।

ঢামেকে চিকিৎসা

আলিয়া মাদ্রাসা চত্বরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত সাতজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলেন– মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হক, মাদ্রাসার ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ, লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সভাপতি শামীম মাহমুদ, লালবাগ ২৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের আহ্বায়ক জানে আলম ও ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রুবেল হোসেন মমিন।

আহত নিছার উদ্দিন রাব্বি বলেন, তিনি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নন। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাদ্রাসা চত্বরে বসে ছিলেন। শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এ সময় লাঠিসোটা দিয়ে মারধর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়।

এদিকে বিকেল ৩টার দিকে ঢাকা কলেজের অডিটোরিয়ামের সামনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে উভয় সংগঠন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা, এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিলাদ হোসেন দাবি করেন, কলেজ অডিটোরিয়ামে তাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মিসভায় যাওয়ার সময় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে হামলা চালান। পরে তারা অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলে ছাত্রশিবির ক্যাম্পাস দখলের চেষ্টা করে। এর প্রতিবাদে ছাত্রদল মিছিল করে এবং ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঢাকা কলেজের সামনে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটান।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সম্পাদক এস এম ফরহাদ। তাঁর দাবি, শহীদদের স্মরণে পূর্বঘোষিত দোয়া মাহফিল চলাকালে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান। এতে ছাত্রশিবিরেরও কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অবস্থান নেন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা কলেজ, নিউমার্কেট ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, জকসু প্রতিনিধি, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীর ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছেন। গতকাল ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটি অভিযোগ করে, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি উত্থাপনের সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা, ভাঙচুর ও সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেন। বিবৃতিতে এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

কবি নজরুল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজে সংঘর্ষ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে জকসু নেতাদের সংঘর্ষের পর এর প্রভাব ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এলাকার সামনেও ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং শহীদ সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে উভয় সংগঠনের অন্তত ৪৫ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে কবি নজরুল সরকারি কলেজের মূল ফটক থেকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।

গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের হল থেকে ১৫ শিবির কর্মীকে পিটিয়ে বের করে দিয়েছে ছাত্রদল

মঙ্গলবার দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মধ্যরাতে সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের হল থেকে ছাত্র শিবিরকে পিটিয়ে বের করে দেয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এই ঘটনায় মেহেদী নামে এক শিবির কর্মী আহত হয়েছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাফিক আর্টস ছাত্রদলের আহ্বায়ক তামিম মাতুব্বর ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মোতাহার হোসেনের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ সময় তাদের কাঁধে ব্যাগ ও কম্পিউটার নিয়ে বের হতে দেখা যায়। পরে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদেরকে মারতে মারতে ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের দিকে নিয়ে যায়। এরপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে মোহাম্মদপুর থানার সামনে দিয়ে এবং ধানমন্ডি ২৭ ক্রসিং পার হয়ে সামনে এসে শেষ করেন। এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

অন্যদিকে আমান উল্লাহ আমানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করেছে ছাত্রদল। গতকাল রাতে মিছিলটি হয়। এ সময় তারা ‘শিবিরের সন্ত্রাস রুখে দাঁড়াও ছাত্রসমাজ, গুপ্তদের আস্তানা জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও’, ‘শিক্ষা সন্ত্রাস একসাথে চলে না’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। গতকাল রাতে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। শাহবাগ মোড় থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি টিএসসি এলাকার দিকে এগিয়ে যায় এবং এ সময় বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেওয়া হয়।

বিএম কলেজের দুই ছাত্রাবাস থেকে শিবিরকর্মীদের বের করে দিল ছাত্রদল

বরিশাল ব্যুরো জানায়, বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। গতকাল বিকেল ৫টার পর এ ঘটনা ঘটে। কলেজের দুটি ছাত্রাবাস থেকে অর্ধশতাধিক শিবিরকর্মীকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এ সময় শিবিরকর্মীরা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ছাত্রদলের সংঘবদ্ধ হামলার মুখে তারা পিছু হটে। বর্তমানে পুরো ক্যাম্পাস ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ছাত্রদলের কয়েক শ কর্মী বিকেলে ফ্লাইট সার্জন ফজলুল হক হল ও মহাত্মা অশ্বিনীকুমার হলে ঢোকেন। তারা বিভিন্ন কক্ষে শিবিরকর্মীদের মারধর করে ছাত্রাবাস থেকে বের করে দেন।

কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রত্যাশী আকবর মুবিন দাবি করেন, ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে ঢুকে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। ছাত্রদল তাদের প্রতিরোধ করেছে। শিবিরকর্মীরা আগ্রাসী ভূমিকা নেওয়ায় কলেজের ছাত্রাবাস ও ক্যাম্পাস থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে শিবিরকর্মী আশরাফুল ইসলাম, আরিফুর রহমান, আবির শিকদার ও আমিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ছাত্রদল সংঘবদ্ধভাবে আকস্মিক ক্যাম্পাসে ঢুকে হামলা চালায় এবং শিবিরকর্মীদের ছাত্রাবাস থেকে বের করে দেয়।

মহাত্মা অশ্বিনীকুমার হলের তত্ত্বাবধায়ক ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনার সত্যতা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি।’

ফ্লাইট সার্জন ফজলুল হক হলের তত্ত্বাবধায়ক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ছাত্রদল শিবিরকর্মীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা সভা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

জামায়াতের প্রতিবাদ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের ওপর হামলার জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করে এক বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

Link copied!